ব্যাকরণ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সমাস। এ-র অর্থ হলো সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ ইত্যাদি। আজ আমরা জানবো সমাস নিয়ে। আজকে আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব তা হলঃ সমাস কাকে বলে? সমাস কত প্রকার ও কি কি বিস্তারিত?

সমাস কাকে বলে?
সমাস সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ। অর্থ সম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। যেমন – বিলাত হতে ফেরত – বিলাতফেরত।
ড. সুকুমার সেনের মতে, ” পরস্পর অন্বয় বিশিষ্ট দুই বা ততোধিক পদকে একপদে পরিণত হওয়াকে সমাস বলে। “
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “পরস্পর অর্থ সঙ্গতি বিশিষ্ট দুই বা বহুপদকে একটি পদ করার নাম সমাস।”
জ্যােতিভূষণ চাকীর মতে, “পরস্পর সম্পর্কিত দুই বা তার বেশি শব্দ একসঙ্গে মিলে সমাস হয়।”
সমাসের প্রতীতি কয়টি ও কী কী?
সমাসের প্রতীতী ৫ টি। এগুলো হলো –
- সমস্ত পদ
- সমস্যমান পদ
- পূর্বপদ
- পরপদ
- সমাসবাক্য/ব্যাসবাক্য/বিগ্রহবাক্য
সমস্ত পদ : সমাসবদ্ধ বা সমাসনিষ্পন পদটিকে সমস্ত পদ বলা হয়। যেমন- সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন। এখানে ‘সিংহাসন’ হলো সমস্ত পদ।
সমস্যমান পদ : সমাসবদ্ধ পদটির অন্তর্গত পদগুলোকে সমস্যমান পদ বলা হয়। উপরের উদাহরণের সিংহ, চিহ্নিত, আসন প্রত্যেকটা শব্দই আলাদা আলাদা সমস্যমান পদ।
পূর্বপদ ও পরপদ : সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশ-কে পূর্বপদ এবং পরবর্তী অংশ-কে উত্তরপদ বা পরপদ বলে। যেমন : দেশের সেবা= দেশসেবা। এখানে ‘দেশের’ হল পূর্বপদ এবং ‘সেবা’ হল পরপদ।
সমাসবাক্য/ব্যাসবাক্য/বিগ্রহবাক্য : সমস্ত পদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ করা হয়, তার নাম সমাসবাক্য, ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য। যেমন- মুখ চন্দ্রের ন্যায় = মুখচন্দ্র। এখানে ‘মুখ চন্দ্রের ন্যায়’ হল ব্যাসবাক্য বা সমাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।
সমাস কত প্রকার ও কি কি?
সমাস ৬ প্রকার। যথাঃ
- দ্বন্দ্ব
- দ্বিগু
- কর্মধারয়
- তৎপুরুষ
- অভ্যয়ীভাব ও
- বহুব্রীহি
দ্বন্দ্ব
যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। এ সমাসে পর্বপদ ও পরপদের সম্বন্ধ বুঝানোর জন্য ব্যাসবাক্যে এবং, ও, আর এ তিনটি অব্যয় পদ ব্যবহৃত হয়। যেমন – ভাই ও বোন = ভাইবোন, মাতা ও পিতা = মাতাপিতা।
দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকারভেদ / শ্রেণীবিভাগ
দ্বন্দ্ব সমাস নানা প্রকার হতে পারে। কয়েকটি হলো –
- মিলনার্থক দ্বন্দ্ব (মাসি ও পিসি = মাসি-পিসি)
- সমার্থক দ্বন্দ্ব (হাট ও বাজার = হাট- বাজার)
- বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব ( দা ও কুমড়া = দা -কুমড়া)
- অলুক দ্বন্দ্ব ( দেশে ও বিদেশে = দেশে-বিদেশে)
- ইত্যাদি অর্থে দ্বন্দ্ব (কাপড় ও চোপড় = কাপড়-চোপড়)
- বহুপদী দ্বন্দ্ব (বই, খাতা ও কলম = বই- খাতা- কলম)
দ্বিগু
সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। এ দ্বিগুতে সমাসনিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমন – তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল, শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী, তিন মাথার সমাহার = তেমাথা।
কর্মধারয়
যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণ ভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধান রূপেই প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন – যে চালাক সেই চতুর = চালাক-চতুর, নীল যে পদ্ম= নীলপদ্ম, শান্ত অথচ শিষ্ট= শান্তশিষ্ট, কাঁচা অথচ মিঠা= কাঁচামিঠা, খাস যে মহল= খাসমহল, হেড যে মাস্টার= হেডমাস্টার, রক্ত যে চন্দন= রক্তচন্দন, যিনি গিন্নি তিনি মা= গিন্নিমা।
কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ / শ্রেণীবিভাগ
কর্মধারয় কয়েক প্রকার। যেমন –
- মধ্যপদলোপী কর্মধারয় (সিংহ চিহ্নিত আসন – সিংহাসন)
- উপমান কর্মধারয়(তুষারের ন্যায় শুভ্র- তুষারশুভ্র)
- উপমিত কর্মধারায় (মুখ চন্দ্রের ন্যায় – চন্দ্রমুখ)
- রূপক কর্মধারয় ( মন রূপ মাঝি – মনমাঝি)
তৎপুরুষ
পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন – বিপদকে আপন্ন – বিপদাপন্ন, শ্রম দ্বারা লব্ধ – শ্রমলব্ধ।
তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদ / শ্রেণীবিভাগ
তৎপুরুষ সমাস ৯ প্রকার। এগুলো হলো –
- দ্বিতীয়া তৎপুরুষ (চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী – চিরসুখী)
- তৃতীয়া তৎপুরুষ (মধু দিয়ে মাখা – মধুমাখা)
- চতুর্থী তৎপুরুষ (গুরুকে ভক্তি – গুরুভক্তি)
- পঞ্চমী তৎপুরুষ (কারা থেকে মুক্ত – কারামুক্ত)
- ষষ্ঠী তৎপুরুষ (রাজার পুত্র – রাজপুত্র)
- সপ্তমী তৎপুরুষ (গাছে পাকা – গাছপাকা)
- নঞ্ তৎপুরুষ (অ (নয়) চেনা – অচেনা)
- উপপদ তৎপুরুষ (পঙ্কে জন্মে যা – পঙ্কজ)
- অলুক তৎপুরুষ (গায়ে পড়া – গায়েপড়া)
অভ্যয়ীভাব
যে সমাসে পূর্বপদে একটি অব্যয় এবং পরপদে একটি বিশেষ্য থাকে এবং অর্থের দিক থেকে পূর্বপদ অর্থাৎ, অব্যয়ের অর্থই প্রাধান্য পায়, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন – কন্ঠের সমীপে – উপকন্ঠ, দিন দিন – প্রতিদিন।
পড়ুন – প্রকৃতি কাকে বলে? প্রকৃতি কত প্রকার ও কি কি?
বহুব্রীহি
যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে, অন্য কোন পদকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন – সহ উদর যার – সহোদর, সমান বর্ণ যার – সমবর্ণ।
বহুব্রীহি সমাসের প্রকারভেদ / শ্রেণীবিভাগ
বহুব্রীহি সমাস ৮ প্রকার। যথাঃ-
- সমানাধিকরণ বহুব্রীহি (খোশ মেজাজ যার – খোশমেজাজ)
- ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি (দু কান কাটা যার – দু কানকাটা)
- ব্যতিহার বহুব্রীহি (কানে কানে যে কথা – কানাকানি)
- নঞ্ বহুব্রীহি (ন (নাই) জ্ঞান যার – অজ্ঞান)
- মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি (গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে – গায়ে হলুদ)
- প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি (ঘরের দিকে মুখ যার – ঘরমুখো)
- অলুক বহুব্রীহি (মাথায় পাগড়ি যার – মাথায়পাগড়ি)
- সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি (দশ গজ পরিমাণ যার – দশগজি)
সমাসের গুরুত্ব
সমাস হলো বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা ভাষার গঠন ও প্রকাশকে সহজতর এবং সংক্ষিপ্ত করে তোলে। সমাসের গুরুত্ব নিচে উল্লেখ করা হলো:
- ভাষার সংক্ষিপ্তি:
সমাসের মাধ্যমে দীর্ঘ বাক্য বা বাক্যাংশকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, “যা অন্ধকারে দেখা যায় না” বাক্যাংশটি “অদৃশ্য” শব্দে রূপান্তরিত হয়। - শব্দের গঠনশৈলী:
সমাস ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে এবং নতুন শব্দ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এটি বাংলা ভাষার সৃজনশীলতাকে বাড়ায়। - লিখিত ও কথোপকথনে প্রভাব:
লেখায় এবং কথোপকথনে সমাস ব্যবহারের ফলে ভাষা অধিকতর শৈল্পিক, গঠনমূলক এবং কার্যকর হয়। - অর্থবোধকতা বৃদ্ধি:
সমাসের মাধ্যমে একাধিক শব্দের অর্থকে একত্রিত করে নতুন এবং সহজবোধ্য অর্থ তৈরি করা হয়। এটি ভাষার গভীরতাকে বাড়ায়। - প্রাচীন সাহিত্য ও শাস্ত্র বোঝা:
প্রাচীন বাংলা সাহিত্য এবং শাস্ত্রে সমাসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। সমাসের জ্ঞান ছাড়া এগুলো বুঝা কঠিন হতে পারে। - শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা:
সমাস ব্যাকরণ শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভাষা চর্চার দক্ষতা উন্নত করে। এটি পরীক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে, সমাস ভাষার গতিশীলতা, শৈল্পিকতা, এবং কার্যকারিতার উন্নয়নে অপরিহার্য।
সমাস নিয়ে এমসিকিউ প্রশ্ন
নিচে সমাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি এমসিকিউ (MCQ) প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হলো। এগুলো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য সহায়ক হবে।
- সমাস কাকে বলে?
ক. শব্দের মিলন
খ. বাক্য রচনা
গ. শব্দের সংক্ষেপণ
ঘ. শব্দের পরিবর্তন
উত্তর: গ. শব্দের সংক্ষেপণ - সমাসের মূল উদ্দেশ্য কী?
ক. বাক্য দীর্ঘ করা
খ. বাক্য সংক্ষেপ করা
গ. শব্দ পরিবর্তন করা
ঘ. শব্দ বিভক্ত করা
উত্তর: খ. বাক্য সংক্ষেপ করা - সমাসের কত প্রকার?
ক. ২
খ. ৩
গ. ৪
ঘ. ৫
উত্তর: গ. ৪ - নতুন শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে কী বলে?
ক. সমাস
খ. সন্ধি
গ. বিভক্তি
ঘ. কারক
উত্তর: ক. সমাস - ‘রাম-লক্ষ্মণ’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. দ্বন্দ্ব
খ. দ্বিগু
গ. তৎপুরুষ
ঘ. বহুব্রীহি
উত্তর: ক. দ্বন্দ্ব - ‘চন্দ্রবিন্দু’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. তৎপুরুষ
গ. দ্বিগু
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: খ. তৎপুরুষ - ‘নরনারী’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. দ্বন্দ্ব
খ. তৎপুরুষ
গ. বহুব্রীহি
ঘ. দ্বিগু
উত্তর: ক. দ্বন্দ্ব - ‘সপ্তর্ষি’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. তৎপুরুষ
খ. বহুব্রীহি
গ. দ্বিগু
ঘ. অভ্যয়ীভাব
উত্তর: গ. দ্বিগু - যে সমাসে পূর্বপদ বিশেষণ এবং পরপদ বিশেষ্য, তাকে কী বলে?
ক. তৎপুরুষ
খ. দ্বন্দ্ব
গ. বহুব্রীহি
ঘ. কর্মধারয়
উত্তর: ঘ. কর্মধারয় - ‘গুরুগৃহ’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. তৎপুরুষ
খ. বহুব্রীহি
গ. অভ্যয়ীভাব
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: ক. তৎপুরুষ - ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. কর্মধারয়
খ. বহুব্রীহি
গ. তৎপুরুষ
ঘ. দ্বিগু
উত্তর: গ. তৎপুরুষ - ‘রাজপুত্র’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. তৎপুরুষ
খ. বহুব্রীহি
গ. অভ্যয়ীভাব
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: ক. তৎপুরুষ - ‘অন্ধকার’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. অভ্যয়ীভাব
গ. কর্মধারয়
ঘ. তৎপুরুষ
উত্তর: গ. কর্মধারয় - ‘দশমণ্ডল’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. তৎপুরুষ
গ. দ্বিগু
ঘ. অভ্যয়ীভাব
উত্তর: গ. দ্বিগু - ‘চিরসবুজ’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. অভ্যয়ীভাব
গ. তৎপুরুষ
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: খ. অভ্যয়ীভাব - ‘কৃষ্ণসার’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. তৎপুরুষ
গ. কর্মধারয়
ঘ. দ্বিগু
উত্তর: গ. কর্মধারয় - ‘জলপাই’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. কর্মধারয়
খ. তৎপুরুষ
গ. বহুব্রীহি
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: ক. কর্মধারয় - ‘অন্নপূর্ণা’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. বহুব্রীহি
খ. তৎপুরুষ
গ. কর্মধারয়
ঘ. অভ্যয়ীভাব
উত্তর: ক. বহুব্রীহি - ‘যাত্রাপথ’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. তৎপুরুষ
খ. বহুব্রীহি
গ. কর্মধারয়
ঘ. দ্বন্দ্ব
উত্তর: ক. তৎপুরুষ - ‘গোস্বামী’ শব্দটি কোন সমাস?
ক. তৎপুরুষ
খ. বহুব্রীহি
গ. দ্বিগু
ঘ. অভ্যয়ীভাব
উত্তর: ক. তৎপুরুষ
এই প্রশ্নগুলো বাংলা ব্যাকরণে সমাস সম্পর্কিত ধারণা পরিষ্কার করতে অত্যন্ত কার্যকর।
তাহলে আজ এখানেই শেষ করছি। সমাস কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি নিয়ে লেখা আর্টিকেলটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন।